• স্বপ্না রায়

সেই যে দিনগুলি...

Updated: Oct 18, 2019

বছরখানেক আগে বালিটিকুরিতে আমাদের বাড়ি গিয়ে সেজদার সঙ্গে রিক্সা করে পুরোনো পাড়াটা ঘুরতে বেরিয়েছিলুম। আটচালার মাঠের কাছে গিয়ে আমি তো অবাক! আরে, এ যে কিছুই চিনতে পারছি না! কোথায় সেই পুরোনো খোলামেলা আটচালা মাঠ, কোথায় আমাদের পুরোনো বাড়িটা আর কোথায়ই বা আমার বন্ধু মায়াদের বাড়ি! চারিদিকে বড় বড় বাড়ি, পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি। পুকুর নেই, গাছগাছালিই বা কোথায়। ছাড়া ছাড়া রেলিং দিয়ে ঘেরা এ কোন শেকল পড়া আটচালা মাঠ! সবই কেমন অচেনা, নতুন।


আটচালা মাঠ থেকে পদ্মপুকুরের দিকে যেতে, ডানদিকে পড়বে ডাকুদা, জয়দেবদা বা তিনেদার বাড়ি। আমাদের ছেলেবেলায় ওখানে ছিল বনজঙ্গলঘেরা ভাঙাচোরা এক ভিটে, মিত্তিরডাঙা। শুনেছি ওটা ছিল অনেক আগে আমার মায়ের মামার বাড়ি। শ্যাম মিত্তিরের ভিটে। অথচ কী ভয়ই না পেতুম ওখান দিয়ে যেতে।সামনেই ছিল কটা গাবগাছ তার দিকে ভয়ে তাকাতুম পর্যন্ত না। শুধু তাই নয় এখন আমরা যেখানে থাকি, যেখানে এখন সজীব সংঘ বা মানসী কিণ্ডারগার্টেন সেই পুরো চত্বরটাই ছিল কেমন ভূতুড়ে মতন। আমরা পা-ই বাড়াতুম না ও রাস্তায়। আর এখন পদ্মপুকুরের পাশে ফার্ণিচারের দোকানের পেছনে যেখানে নারাণদা আর মায়ী থাকে ওখানে ছিল খুদিদিদিমার বাড়ি, বাড়ি না বলে ভগ্নস্তূপ বলাই ভালো। সেখানে আমরা মাঝেসাজে যেতুম ইতু বা মঙ্গলচণ্ডীর পুজো দিতে সম্ভবত। দু তিন ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতুম ওখানে। ওটা কিন্তু এদিক থেকে আবার মিত্তির ডাঙার লাগোয়া। সেখানে বুনো লতায় ছোট্ট ছোট্ট গোলাপি ফুল ফুটে থাকত থোকায় থোকায়।


এখনও চোখ বুজলেই দেখতে পাই আটচালার মাঠের সামনে আমাদের সেই পুরোনো বাড়িটা। ভাঙাচোরা পুরোনো নড়বড়ে একটা বাড়ি। সহদেব সরকারের ঐ বাড়িতেই ভাড়া থাকতুম আমরা।বাড়িটার বাঁ দিকে সন্ধ্যাদি, নকিদা আর মায়াদের বাড়ি। পশ্চিম দিকে দুলাল মামা বিশুমামাদের বাড়ি।


একেবারে ছোট বেলার কিছুটা বাদ দিলে প্রি ইউ পরীক্ষা পর্যন্ত ঐ বাড়িতেই কেটেছে আমার। তার আগে আমরা থাকতুম বিশুবাবুদের বাগানবাড়ি বলা হত যাকে সেই বাড়িতে। বিশাল এলাকা জুড়ে ছিল সেই বাগান আর তার বাড়ি। অল্প সময়ের জন্য হলেও সে বাড়ির স্মৃতি আমার কাছে যেন চন্দন কাঠের কৌটোয় ভরা মণিমুক্তো। অনেক ইতিহাস, অনেক গল্প জড়িয়ে আছে তার সঙ্গে। এবারে গিয়ে দেখি ইট কাঠ সিমেণ্ট আর লোহা লক্কড়ের আড়ালে কোথায় হারিয়ে গেছে সেই গাছপালা পুকুর ঝিল আমের বাগান!


এদিকে পুরোনো বাড়ির একেবারে সামনেই ছিল একটা পুঁচকি মাঠ। ওখানেই চু কিতকিত, লুকোচুরি, কানামাছি, এক্কাদোক্কা খেলা আমাদের। কাবাডিও খেলতুম। পরে তো আটচালা মাঠে প্রমোশন হল আমাদের। ওখানে শিরোগিজো (দাড়িয়াবান্ধা) কাবাডি এসব খেলতুম। হ্যাঁ, ছেলেদের সঙ্গেও চলত খেলা।


পড়তুম মুক্তারাম প্রাইমারি স্কুলে। স্কুলে যাবার সময়, না আটচালা মাঠের সামনে দিয়ে, অজু মঞ্জুদের বাড়ির সামনে দিয়ে নয়, পশ্চিম দিকে কাশীদের বাড়ির পাশের গলি, ছোট্ট মতন মাঠ পেরিয়ে সাবিত্রী গায়ত্রীদের (গৌরেদা) বাড়ির সামনে দিয়ে সটকার্ট করে সোজা এসে পড়তুম এখনকার হাউসিং এস্টেটের সামনে। । তার পরে ডান দিকে একটু ঘুরলেই তো অসীমাদির কোয়ার্টার। প্রায় ওই জায়গাতেই ছিল এক মস্ত বড় ঝুপসি মতন তেঁতুল গাছ। স্কুল আসতে যেতে তার ডাল ধরে আমরা কত দোল খেয়েছি, কাঁচা তেঁতুল পেড়ে খেয়েছি। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বন্ধুরা মিলে কত আড্ডা মেরেছি। হাউসিং-এ ঢোকার আগে বাঁ দিকে ছিল পানের বরজ। প্যাঁকাটি দিয়ে ঘেরা কেমন আলোছায়া মাখা ছিমছাম নিরালা সেই বরজ, এখনও মনের ক্যামেরায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। স্কুলে যাবার পথে বাঁ দিকে হাউসিং এর ঝিলের পাশে ছিল বাঁশঝাড়। না, খুব ঘন নয়, তখনই কাটতে কাটতে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এসেছে সে। এখনও মনে হয় কোন দূর দেশ থেকে ওরা যেন চেয়ে আছে সেইখানটার দিকে, সেই ক্ষণটার পানে, অপলক।


আমার স্কুল পর্যন্ত পায়ে চলা সেই রাস্তার আরও খুঁটিনাটি কত কিছু যে ধরা আছে মনের মণিকোঠায়। সব বলতে গেলে এ লেখা শেষই হবে না। তবে হ্যাঁ, জানিয়ে রাখি এখন যেখানে হাউসিং এর বড় গেট — এখন সে জায়গাটা কেমন হয়েছে জানি না। আমি এটা দেখেছি অনেক আগে, অসীমাদি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে যাবার পালাও তো শেষ! আমাদের ছেলেবেলায় ওখানেই এসে থামত ৫৩নং বাস! আশপাশের ওই চত্বরটা জুড়েই ছিল বাসস্ট্যাণ্ড। এখন যে গলির মোড় থেকে আমরা বাসে উঠি , ওর উল্টোদিকেই তো ছিল মার্টিন রেলের ছোট্ট স্টেশন। কু ঝিকঝিক করে গাড়ি যেত হাওড়া ময়দান, কি ওদিকে মাকড়দা ডোমজুড়... আমার কলেজ যাওয়া তো ঐ ছোট্ট রেলে চড়েই। কী সব দিন ছিল তখন!


তখন ক্লাস থ্রী কি ফোর-এ পড়ি। মেজদা, সেজদা যেমন ক্লাস নিত আমাদের, তেমনি নতুন আসা ব্রজেন স্যার, সেজদার বন্ধু অরবিন্দ স্যার, কালিপদবাবু এঁরাও ক্লাস নিতেন। ছিলেন গৌরস্যার। মেঘনাদ স্যার, বোধহয় এসেছেন আরও অনেক পরে। তখন ইংরেজি পড়ানো হত কিনা মনে পড়ছে না ঠিকমত, কিন্তু ব্রজেনবাবু এসে আমাদের শেখাতেন নানারকম ইংরেজি শব্দ। কান, চোখ, গাল জিভ এসবের ইংরেজি শেখাতেন আর পরে উঁচু ক্লাস মানে ফোর কি ফাইভের ক্লাসে আমাদের ডেকে পাঠাতেন আর ওরা যখন বলতে পারত না, আমরা তখন টপাটপ উত্তর দিয়ে দিতুম। কী আনন্দ কী গর্ব যে হত তখন! এখনও আমাদের সেই খুশি খুশি মুখের উজ্বল ছবিটা দেখতে পাই।

তখন আমরা আমার সেজদা, ন্যাপাদা, খ্যাপাদা, কালিদাসদার তত্ত্বাবধানে শিখতুম আবৃত্তি। আর নানা জায়গায় আবৃত্তি করে বেড়াতুম। চারদিকে খুব আবৃত্তি প্রতিযোগিতার ধুম ছিল তখন। আমি অবশ্য খুব একটা ফার্স্ট সেকেণ্ড হতে পারতুম না। ওই কখনও হয়তো শিকে ছিঁড়ে জুটত থার্ড প্রাইজ। তবে দুর্গা(মান্না), সাবিত্রী(সাবি) গায়ত্রী(গাতি) বা মায়ার ফার্স্ট সেকেণ্ড ছিল বাঁধা। এই আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় যাওয়া আর তাতে অংশগ্রহণ করা নিয়ে কত যে মজার মজার ঘটনা আছে তা বলার নয়।


ঠিক কোন ক্লাসে পড়ি মনে নেই, ফোর ফাইভই হবে সম্ভবত- আমরা কয়েকজন মিলে আমি মায়া, সুমিত(শেঠ),দুর্গা আর কে কে যেন বের করেছিলুম হাতে লেখা পত্রিকা ‘বর্তিকা’। সেখানে আমি লিখেছিলুম একটা রম্যরচনা টাইপের লেখা-‘ইনফ্লুয়েঞ্জায় কয়েকদিন’। সেই মাথা কনকন, গা ঝনঝন আর বিছানায় শুয়ে থাকার কষ্টটাই একটু রসিয়ে রসিয়ে লিখেছিলুম আর কী। সেটাই আমার প্রথম লেখা বলা যায়। বড়রা পড়ে লেখাটার প্রশংসা করেছিলেন এটুকু মনে আছে। কিন্তু বাদবাকি ব্যাপারটা আর কিচ্ছু মনে নেই। একবার যেন শুনেছিলুম পত্রিকাটা লাইব্রেরিতে আছে। কি জানি ভুলও হতে পারে। এমনিতেই আমাদের বাড়িটা ছিল ছোট বড় সকলের একটা আড্ডার জায়গা। গান আবৃত্তি এসবের রিহার্সাল তো হতই,নানা রকম আলাপ আলোচনাও চলত। সকলের জন্যই সে বাড়ি ছিল অবারিত দ্বার।


সজীব সংঘের দুর্গা পুজো হত আটচালা মাঠে। কদিন ধরে সে কী উদ্দীপনা, উৎসাহ আর আনন্দের মেলা। বেশির ভাগ আয়োজনটাই হত আমাদের বাড়িতে। মাঠের সামনেই বাড়ি, সব যোগাড় যন্ত্র এখানেই হত।পাড়ার দিদিমা মামীমা দিদিরা অনেকেই এসে হাতেহাতে যোগাড় করে দিত। কদিন শুধু বাড়ি আর আটচালা মাঠ। কী হইচই কদিন ধরে! তারপর বিজয়া দশমীর পরে কোন একদিন হত বিজয়া সম্মিলনী- খুব অন্তরঙ্গ ঘরোয়া মেজাজ ছিল তার । একবার কেদারনাথ হাসপাতালের চত্বরে হয়েছিল এই অনুষ্ঠান। ভারি সুন্দর। আমি একটু বক্তব্যও যেন রেখেছিলুম মনে হচ্ছে।

মাঠে তখন ফুটবল খেলা লেগেই থাকত। এমনি পাড়ার ছেলেদেরই ফুটবল কিন্তু সকলের কী উৎসাহ! না, ক্রিকেটের রমরমা কেন, ক্রিকেট নিয়ে কোন কথাবার্তাও তখন হত বলে মনে পড়ে না। আর ছিল গানবাজনার ফাংশান,নাটক এসব। আমরা কতবার নাটক করলুম ওখানে। একবার লক্ষ্মীর পরীক্ষা, মায়া হল ক্ষীরি, আমি রাণী কল্যাণী, মালতী মঞ্জু- নাকি বনি!(ঘোষাল) এই রকম সব চরিত্রে আমাদের নেমে পড়া। আমি আর মায়া মিলে একবার কর্ণকুন্তী সংবাদ, আর একবার কচ দেবযানী করলুম। বিরাট কবিতা মুখস্থ করেই করছি। স্টেজের ঠিক সামনেই আমার মেজদা, সেজদা, মায়ার কাকা কার্তিকদা, ন্যাপাদারা বসে আছে। ভুল করলেই ক্যাঁক করে চেপে ধরবে। আর আমাদেরও চ্যালেঞ্জ কিছুতেই ভুল করা চলবে না। প্রাণপণে মুখস্থ করেছি। ভুল ধরলেই হল!


আর একবার কী মজাই যে হয়েছিল! তখন পড়ি ইউনিভার্সিটিতে। আমরা মেয়েরা ঠিক করলুম আমরা নিজেরা নাটক করব- রবীন্দ্রনাথের ‘মালঞ্চ’। পঞ্চাননতলায় থাকা আমার বন্ধু মঞ্জুও এতে অংশ নেবে বলে ঠিক হল। কাস্টিংটা হচ্ছে এরকম- আমি আদিত্য, মঞ্জু আমার ভাই রমেন আর মায়া আমার বৌ ভীষণ অসুস্থ নীরজা। আছে আরও অনেকে ছোট বড় নানা চরিত্রেসব। নাটক শুরু হতেই দেখা গেল নীরজা (মায়া) বিছানায় শুয়ে আর মঞ্চে ঢুকছে রমেনবেশী মঞ্জু। শুরুতেই হঠাৎ ছেলেদের পোশাকে মঞ্জুকে দেখে মায়া পার্ট ফার্ট ভুলে এমন হাসতে শুরু করল সে কী বলব। আমরা ভেতর থেকে যতই চোখ পাকাই, দাঁত কিড়মিড় করি বা ইশারায় চুপ করতে বলি না কেন, মায়ার হাসি আর থামেই না। মঞ্জু এদিকে একটা চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে দিব্যি ওর পার্ট বলে যাচ্ছে। দর্শকরাও বুঝে গেল এটা নাটকের বাইরের নাটক, তারাও সবাই হাসতে শুরু করল। সে কী কেলেঙ্কারি! পরে আরও সব মজার মজার কাণ্ড হয়েছিল সে সব বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। আমরা শুধু মেয়েরা এই নাটক করছিলুম ঠিকই তবে পাড়ার দাদারা হেল্প না করলে কিছুই হত না। কালিদাসদা (কিরীটি মান্না) ছিল আমাদের নির্দেশক আর প্রম্পটার, সম্ভবত ড্রেসারও। অনেকেই ছিলেন আর নাম মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে।


আমাদের আরও ছোটবেলায় পাড়ার অনেককেই দেখেছি নাটক বা যাত্রাপালায় অংশ নিতে। একটা কোন যাত্রায় আমার বড়দাকে (বৈদ্যনাথ দত্ত) আর একটা কোন হাসির নাটকে সেজদাকেও (শ্যামসুন্দর দত্ত) দেখেছি। আরও অনেকেই পাড়ার ছিলেন তাঁদের নাম এখন আর ঠিক মনে পড়ছে না।


তবে একটা কালীকীর্তনের দল ছিল তখন। তাঁরা ঘুরে ঘুরে পাড়ায় পাড়ায় কারোর না কারোর বাড়িতে গান গেয়ে বেড়াত। সম্ভবত সেই দলে নরেন ঘোষ, ফটিকদা(!), বড়দা ও আরও কেউ কেউ ছিলেন। এর মধ্যে ফটিকদা ছিলেন বেশ মনে রাখার মতো একজন মানুষ। ছিলেন খুব জনপ্রিয়ও। আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ এক কারখানায় কাজ করতেন, কিন্তু অন্য দিকে তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক এক মানুষ। তাঁর লেখা চারখানা খাতা আমি পেয়েছি। নিয়মিত লেখালেখি তো করতেনই, লিখতে ভালোবাসতেন। প্রথাগত বিদ্যা তাঁর ছিল না, অথচ তাঁর লেখা পড়ে আশ্চর্য হতে হয়। সামাজিক রাজনৈতিকভাবেও ছিলেন যথেষ্ট সচেতন তাঁর লেখা সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে উঠেছে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, আসলে তিনি চেষ্টা করেছেন, নিজের পরিবেশকে অতিক্রম করে সম্পূর্ণ অন্য এক জগতের আস্বাদ নিতে নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। এখানেই তাঁর সার্থকতা, অনন্যতা। খুশি খুশি হাস্যোজ্জ্বল মুখে ছিল এক সদাপ্রসন্ন ভাব। যেখানেই যেতেন কথাবার্তায় হাসিঠাট্টায় একেবারে জমিয়ে দিতেন।পরকে আপন করে নেবার এক সহজাত ক্ষমতা ছিল তাঁর।। রসবোধ ছিল প্রচুর। বালিটিকুরীর সব মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসতেন । যেন বালিটিকুরীর ‘দাদাঠাকুর’।


এদিকে সুধাংশুদা, ন্যাপাদা, মেজদা, সেজদা এরা সবাই মিলে আমরা যারা স্কুল ফাইনাল দেব কি নাইনে পড়ছি তাদের কোচিং দিত। না প্রফেশনাল কোচিং সেন্টার নয়। এ হচ্ছে একেবারেই স্বতস্ফূর্ত ব্যাপার- প্রাণের আনন্দে, কর্তব্যের তাগিদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। প্রত্যেক রবিবার হত ক্লাস। বিশেষ করে অঙ্ক আর ইংরেজি।


যতদূর মনে পড়ে তখন লাইব্রেরি ছিল কালীবাড়ি মানে শৈলবাবুদের বাড়িতে আর কি। শুনেছি শুরু হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। আজ থেকে পঁচাত্তর বছর আগে। ওনাদের বাড়ির নিচের তলার একটা ঘরে ছিল কটা ছোট বড় আলমারি, সেখানেই আমরা যেতুম বই নিতে। এই বাড়ির উঠোনে কালীপুজোর সময় বাজি ফাটানো হত। হত তুবড়ি প্রতিযোগিতা। আমরা দেখতে আসতুম। পাঁঠা বলিও হত। কিন্তু তখন আর কি থাকি সেখানে!


তারপর তো লাইব্রেরি এই বিশ্বনাথদার (ঘোষাল) বাড়ির পাশে উঠে এলো। সেটা ঠিক কবে আমার মনে নেই। আমি তো সেই উনিশশো আটষট্টি থেকেই বালিটিকুরির বাইরে। তবে লাইব্রেরির কথা বললেই আমার বাবার কথা মনে পড়ে। বাবার ছিল ভীষণই বই পড়ার নেশা। খেতে খেতে বই পড়ত, লাইব্রেরিতে যাবার সময় পারলে হাঁটতে হাঁটতেই বই পড়ে। লাইব্রেরির নিয়মিত বললে কম বলা হয়, অতি নিয়মিত পাঠক ছিল। কত রকমের বই যে আনত! আর আমিও আমার সীমারেখা ছাড়িয়ে সেসব বই গোগ্রাসে গিলতুম। এমন কি পরীক্ষার আগের রাতেও লুকিয়ে বই পড়তে বুক কাঁপত না। বাবা-মায়ের বিছানাটাকেই মা বলত 'লাইব্রেরি'। ক্ষুদ্রতম সংস্করণ হলেও আজও আমাদের জীবনে পরিব্যাপ্ত!